এক.
এশার নামাজ শেষ করে জমিরুদ্দীন সরদার কালুর কাছে এক গ্লাস পানি চাইলেন। আজ তার গলাটা বার বার শুকিয়ে যাচ্ছে। কালু পানি নিয়ে প্রস্তুত ছিল। কালু জমিরুদ্দীন সরদারের ডান হাত। সে সব সময় তার সাথে ছায়ার মত থাকে। পানি দিয়ে তার চলে যাওয়ার কথা, কিন্তু সে দাঁড়িয়ে আছে। তার মানে সে কিছু বলতে চায়। জমিরুদ্দীন সরদার কালুকে গুরুত্ব দিলেন না, তিনি কাঁচের গ্লাসের দিকে তাকিয়ে আছেন। কালু দাঁড়িয়ে আছে থাক। দাঁড়িয়ে থাকাই তার কাজ। তিনি কিছু জিজ্ঞাসা না করলে কালু কিছু বলবেও না। পানির মধ্যে একটা ছোট্ট কালো কুটি দেখা যাচ্ছে। পানিটা ফেলে কালুকে নতুন পানি আনতে বললেই সে আনবে কিন্তু বলতে ইচ্ছে করছে না। কুটিটা ধীরে তলিয়ে যাচ্ছে...যাক। তলিয়ে গেলে তখন পানিটা খাওয়া যাবে।
রমিজ মিয়ার মেজাজ বেজায় খারাপ! বাইরে কিছুটা হাঁটাহাঁটি করতে পারলে রাগ কিছুটা কমত! কিন্তু বাইরে টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছে। এত রাতে বৃষ্টির মধ্যে বাইরে বের হওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ না। তার সামনে এখন ঘোর বিপদ। তাকে এখন বুদ্ধি খাটিয়ে কাজ করতে হবে। পাশের ঘরে তার স্ত্রী আর একমাত্র কন্যার কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছে। এই কিছুক্ষণ আগে মেয়ের গালে তিনি কয়েকটা থাপ্পড় বসিয়ে দিয়েছেন! এত বড় মেয়ের গায়ে হাত তোলা ঠিক না। তার স্ত্রী জমিলা বেগম বাঁধা দিতে আসলে তাকেও একটা থাপ্পড় দিয়েছেন। আসলে মেজাজ খারাপ হলে তিনি জ্ঞান শূন্য হয়ে যান।
চেয়ারম্যান বাড়িতে আজ হুলুস্থুল অবস্থা। একটা গরু জবেহ করা হয়েছে। বাড়ির বাইরে গাছের সাথে একটা ছাগল বেঁধে রাখা হয়েছে। আকরাম খাঁ’র ‘গ্রিন সিগনাল’ পেলেই জবেহ করা হবে, মৌলানা সাহেব ছুরি হাতে তৈরি। মৌলানা সাহেবের আজ অন্য কোনো কাজ নেই, এই বড় বাড়িতে তাঁর দাওয়াত।
বড় পুকুরে জাল ফেলার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। চেয়ারম্যান আকরাম খাঁ পুকুর পাড়ে একটা চেয়ার নিয়ে চিন্তিত মুখে বসে আছেন। জাল ফেলার আগে জেলের ভাব দেখে উনার সন্দেহ হচ্ছে। রোগা পাতলা চেহারার জেলে। তার ধারণা জাল ফেলার সাথে সাথে ধাক্কা খেয়ে জেলেও পানিতে পড়ে যাবে! প্রথম বার জাল ফেলাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জাল তোলার পর যদি বড় মাছ না ওঠে, যার নামে জাল ফেলা হয় তার অমঙ্গল হয়।
মধ্যরাতে জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকালে নিকোটিন আসক্তদের মস্তিষ্ক সর্ব প্রথম নিকোটিনের অভাব জানান দেয়। এবং নিশ্চিত ভাবে তখন সিগারেটের প্যাকেট যথারীতি খালি থাকে! আনিসের কথা না, এটা ওর সব থেকে কাছের বন্ধু শফিকের বয়ান! শফিকের কথা গুলো আনিসের কাছে এখন বয়ানের মতই। গত দু’মাস শফিকই আনিসের ত্রাতা! যদিও শফিক ছেলেটা আনিসকে খুব পছন্দ করে এবং তারা খুব ভাল বন্ধু, তবুও এই শহরে একজন মানুষের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হলে তার কাছে নিজেকে একটু ছোট হতে হয়! এটাই নিয়ম! পাঁচ মাসের মেস ভাড়া আর দুই মাসের খাওয়া খরচ বাঁকি রেখে এক রকম পালিয়েই আনিস শফিকের রুমে উঠেছে।
রাত ৩টা বেজে ৪৫ মিনিট। ঘড়ি তার আপন মনে সময় জানান দিয়ে যাচ্ছে। অবনীর আরও একটি নির্ঘুম রাত। শিহাবকে আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি। গত তিন দিন ধরে শিহাব নিখোঁজ। শিহাবের বন্ধু, পরিচিত কয়েকজন, থানা সব জায়গাতে অবনী তার মুঠোফোন নাম্বার দিয়ে রেখেছে। দিনে অথবা রাতে যখনই জীবিত অথবা মৃত শিহাবের খবর পাওয়া মাত্র যেন তাকে জানানো হয়। লাশ পাওয়া যাওয়ার সম্ভবনাটাই নাকি বেশি। উত্তরা থানার ওসি জামিলুর রহমান অবনীর ভাইয়া আবীর চৌধুরীর বন্ধু। তিনি বললেন শিহাব নাকি রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল। তার সন্দেহ, ভিক্টিম রাজনৈতিক গুম। তাই তিনদিন পরে জীবিত পাওয়ার সম্ভবনা খুবই ক্ষীণ। লাশটাও পাওয়ার সম্ভবনাও খুব কম। পাওয়া গেলেও বিচ্ছিন্ন ভাবে।
শেষ রাতের দিকে হঠাৎ লোপার ঘুম ভেঙে গেল। ইদানিং প্রায়ই এমন হচ্ছে। মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে যায়। তখন খুব কষ্ট হয়। বুক ফেটে কান্না আসে। অমি’র কথা মনে হয়। অমিকে দেখতে ইচ্ছা করে। জানতে ইচ্ছা করে, অমি কেন তার সাথে এমনটা করল? সে তো কখনো কারো ক্ষতি করেনি, কাউকে কষ্ট দেয়নি। তাহলে তার সাথেই এমনটা কেন? জবাবটা লোপা হয়ত কোনো দিনই পাবে না কারণ লোপার সামনে দাঁড়ানোর সাহস অমি অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছে। শেষ যে দিন অমি ফোন করেছিল সে দিন ওর কণ্ঠ শুনে লোপার খুব মায়া হচ্ছিলো।
মায়ের কথা মনে আসলেই নিতুর ঘেন্না লাগে! রাহেলা বেগম মা হিসেবে হয়ত খুব একটা খারাপ ছিল না কিন্তু মানুষ হিসেবে সে জঘন্য! তাই নিতু কখনো তার কথা ভাবতে চায় না। কিন্তু শেফা ছোট মানুষ। ও মাঝে মধ্যেই মায়ের কথা জানতে চায়। ‘আপা, আমার মা কোথায়?’ ‘মা দেখতে কেমন ছিল, আপা?’
-শেফা, আমার সামনে আর কক্ষনো তার কথা বলবি না!
-কিন্তু কেন আপা? সবার মা আছে শুধু আমার মা নেই কেন আপা?
-উফ্! এই মেয়েটা এত প্রশ্ন করতে পারে! তোর মা মারা গেছে!
-মারা গেলে মানুষ কোথায় যায় আপা?
আকাশে মেঘ দেখার পরও বের হওয়াটা বিরাট বোকামি হয়েছে! ছোটমনি ইমনকে বারবার তাঁর বাসায় থেকে যেতে বলছিল,
‘এত রাতে মেঘ-বৃষ্টি মাথায় করে বের হতে হবে না, রাতটা থেকে যা!’
-না, ছোটমনি! থাকলে চলবে না, যেতেই হবে। আর যে কাজে এসেছিলাম সে কাজ তো হয়েই গেল!
-মানে?
-মানে তোমার সাথে অনেক দিন পর দেখা হল। আজ আমি উঠি।
-রাস্তাতে উঠেই একটা সিএনজি অটোরিক্সা নিয়ে নিবি। বাসায় গিয়ে আমাকে জানাবি...।
আধ খাওয়া সিগারেটের টুকরোটা রাস্তার মাঝখানে ফেলে টাই পরা অগোছালো এক যুবক ফুটপাতে বসে সিগারেটের দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। তাকে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছে। পাশে একটা ফাইল পড়ে আছে। যুবকের নাম মামুন। আজ সকালে তার চাকরীর ইন্টারভিউ ছিল। প্রায় নতুন একটা কোম্পানি। ইন্টারভিউ বোর্ডের মানুষ গুলোর মুখ দেখে মামুন শিওর চাকরীটা তার হচ্ছে না! এ নিয়ে তো আর কম হল না! তবে সে ইন্টারভিউটা নিয়ে চিন্তিত না।
বারান্দাটা এতো ছোট তার উপর এক পা ভাঙ্গা একটা চেয়ার রাখাতে এক জনের বেশি দাঁড়ানো যায় না। চেয়ারটাতে বাবার অনেক স্মৃতি। বাবা মারা যাওয়ার পর এই চেয়ারটার উপর খুব মায়া পড়ে গেছে। তিনতলায় ছোট্ট ছোট্ট দুইটা ঘর, আসবাব পত্র দিয়ে ভর্তি। চেয়ারটা রাখার মত জায়গা নেই, তাই মিতু ওটাকে বারান্দায় রেখেছে। জোছনার আলোতে মিতু তার ছোট্ট বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সে আশ্চর্য হয়ে খেয়াল করছে আজ জোছনার আলো তাকে গ্রাস করতে পারছে না। ঘরে অসুস্থ মা, তাঁর ওষুধ শেষ।